প্রথম অধ্যায়: দুর্ভাগা পাঁচজনের দল
ঘন অরণ্যের ভেতর দিয়ে একদল মানুষ এগিয়ে চলেছে। তাদের দলে মোট পাঁচজন—তিনজন পুরুষ, দু’জন নারী। তাদের অবস্থা সত্যিই করুণ। আসলে উপায়ও নেই; ঝিরঝিরে তুষারপাতের মধ্যে, চারপাশ জুড়ে কেবলমাত্র আদিমতার ছাপ ফুটে থাকা শীতল অরণ্যে, গ্রীষ্মকালের হালকা কাপড় পরে চলা—এমন কষ্টে কে-ই বা আনন্দ উপভোগ করবে!
অবশ্য, যদি তারা একটু দ্রুত চলতে পারত, তবে হয়তো শরীরের উত্তাপে কিছুটা গরম লাগত; তাদের মনেও নিশ্চয়ই সেই ইচ্ছা ছিল। কিন্তু আকাশে যখন বরফ ঝরছে, তখন পায়ের নিচের জমে থাকা তুষারও আধা মিটার পুরু। দৌড়াতে চাইলে? শুধু চেষ্টাই থেকে যাবে।
তাই, দৃঢ়চেতা মানুষগুলো এক পা এক পা করে জমে থাকা তুষারে গর্ত করতে করতে এগিয়ে চলেছে। আর যারা দুর্বল, তারা কেবল মৃত্যুর অপেক্ষায়।
পাঁচজনের মধ্যে একজন বৃদ্ধ, বয়স পঞ্চাশের কোঠায়, মাঝারি গড়ন, গায়ে পাতলা কাপড়ের শার্ট, নিচে ট্রাউজার। এই মুহূর্তে তার শার্ট কোমরের ভেতরে গুঁজে রাখা, আর হাতে একটা মেলে ধরা ভাঁজ করা পাখা, সেটা পেটের কাছে ধরে রেখেছে।
‘‘ভাগ্যিস, এই পাখার কাপড়টা রেশমের!’’ বৃদ্ধ কষ্ট করে হাঁটতে হাঁটতে বিড়বিড় করল।
বৃদ্ধের পাশাপাশি ছিল ত্রিশোর্ধ্ব এক যুবক। তার মুখে অল্প গোঁফ, যা বরফে ঢাকা। তার অবস্থা আরও শোচনীয়, সে কেবল একটি গেঞ্জি ও বড় প্যান্ট পরে আছে। পা খালি, তুষার থেকে তুলতেই বোঝা যায়।
‘‘শুধু একটু মজা করতে গিয়েছিলাম, এখন এই দশা!’’ যুবক গলা ঝাড়া দিয়ে বলল, নাক দিয়ে পানি পড়ছে।
তৃতীয় জন একজন নারী, বয়স সাতাশ-আটাশ হবে। তার পরনে সাদা রঙের অফিসের পোশাক, যা বরফের মাঝে ঝকঝকে চমক দিচ্ছে। তবে এই পোশাকের একটা বড় অসুবিধা—নিম্নাংশ ছোট স্কার্ট, যেখানে উরুর খানিকটা অংশও খোলা।
‘‘ইশ! যদি জানতাম, তাহলে লম্বা মোজা পরতাম! অন্তত এক স্তর কাপড় হতো!’’ এক হাতে হাই হিলের জুতো, অন্য হাতে ব্যাগ ধরে শরীর ঢাকার চেষ্টা করছে সে।
এরপর আছে বিশের কোঠার এক তরুণ। বয়স কম হলেও, তার মুখ বরফে লাল হয়ে আছে, মুখে কোনো ভাব প্রকাশ নেই। তার গায়ে সুতির টি-শার্ট, নিচে জিন্স—এই দলে এটিই সবচেয়ে ‘উন্নত’ পোশাক। তাই যুবকের মাঝে মাঝে ছোঁ মেরে তাকানো দৃষ্টিতে সে সতর্ক হয়ে বলে, ‘‘দাদা, আমি… আমার ভেতরে কিছু পরিনি!’’
শেষে আছেন এক নারী পুলিশ, বয়স তরুণ। সে-ও প্রায় ওই তরুণের বয়সী। পুলিশের গ্রীষ্মকালীন পোশাকের জন্য তার কষ্ট তুলনামূলক কম, আর তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বারবার যুবক ও তরুণের দিকে ছুড়ে দিচ্ছে, ‘‘তোমরা ভালো হয়ে থেকো, নইলে… হুঁ!’’
‘‘উফ!’’
বৃদ্ধ হঠাৎ পা পিছলে বরফে পড়ে গেল।
‘‘ফে কাকু, আপনি ঠিক আছেন তো?’’ তরুণ ছুটে গিয়ে তাকে ধরে তোলে। তার ঠোঁট নীল হয়ে গেছে, শরীর কাঁপছে, তবু বৃদ্ধ ঠোঁট মেলে শুকনো হাসি দিল।
‘‘এভাবে আর চলা যাবে না। নইলে আমরা সবাই বরফে জমে মরে যাব!’’ যুবক চেঁচিয়ে উঠল। সে শক্তিশালী হলেও, এমন প্রতিকূলতায় তার তা কোনো কাজে আসছে না।
‘‘তবে কী করব? সামনে কোনো জনপদ নেই, পেছনেও না; মোবাইলও কাজ করছে না। আমরা কী করব?’’ অফিসপোশাকপরা নারী চেঁচিয়ে উঠল।
‘‘আমরা বরফ দিয়ে ঘর বানাতে পারি, এতে ঠান্ডা বাতাস আটকানো যাবে!’’ যুবতী পুলিশ কিছুক্ষণ ভেবে বলল।
‘‘আমরা কি এস্কিমো যে, বরফের ঘর বানাব? তার ভেতরও তো তাপমাত্রা শূন্যের নিচেই থাকবে!’’ বৃদ্ধ মন্তব্য করল।
‘‘তা-ই তো, আর আমাদের অবস্থা দেখে তো মনে হয়, ঘর তৈরি শেষ হবার আগেই জমে মরব!’’ যুবক সম্মতি দিল।
‘‘তবে উপায়?’’ তরুণ চিৎকার করল।
‘‘শুধু একটাই পথ—চলতেই হবে, যতক্ষণ না কোনো মানুষ পাই!’’ বৃদ্ধও চেঁচিয়ে উঠল।
‘‘ফে কাকু, এটা অসম্ভব! এখানে বন, গাছগাছালির জঙ্গল!’’ অফিসপোশাকপরা নারী বলল।
‘‘আমরা তো মাত্র আধ ঘণ্টা চলেছি, এতটা দুর্বল নই। চলতে থাকো, নইলে সবাই এখানেই মরে যাব!’’ যুবক দৃঢ় গলায় বলল।
‘‘কিন্তু আর কতদূর চলতে পারব আমরা? আমি মরতে চাই না... আহহহহ!’’ দীর্ঘ চিৎকারে বোঝা গেল, সেই নারীর ফুসফুস বেশ মজবুত।
‘‘আউউউ...’’
‘‘কী শব্দ?’’
‘‘বন্য প্রাণী এসেছে!’’
‘‘এটা কোন বন্য প্রাণী, কেউ জানে?’’ অফিসপোশাকপরা নারী জিজ্ঞেস করল।
‘‘শুনে তো মনে হচ্ছে... চিড়িয়াখানার বাঘের মতো!’’ বৃদ্ধ কষ্টের হাসি হেসে বলল।
‘‘বলেছিলাম তো, নিশ্চয়ই আমরা উত্তর অঞ্চলে! এবার কী হবে? এখানকার বাঘ পৃথিবীর সবচেয়ে বড়, সিংহের চেয়েও ভয়ংকর, এখন আমরা কী করব?’’ নারী মুখ ঢেকে ফিসফিস করে বলল।
‘‘ঠিক আছে, লো, তুমি পুলিশ, তোমার বন্দুক...’’ তরুণ নারী পুলিশ সদস্যের পকেটে লেখা ‘পুলিশ’ শব্দ দেখে চুপ মেরে গেল।
‘‘মা, তুমি তো সাংবাদিক, ক্যামেরা দেখিয়ে ভয় দেখাও...’’ তরুণের কাছে ছোট ক্যামেরা দেখে যুবকও থেমে গেল।
‘‘আমার ব্যাগে যেন...’’ অফিসপোশাকপরা নারী ব্যাগ থেকে একটা আয়তাকার যন্ত্র বের করল।
‘‘ইলেকট্রিক সেফটি ডিভাইস!’’ যুবক ও তরুণ একসাথে চিৎকার করল।
‘‘তোমরা দেখছি এই জিনিস বেশ চেনা!’’ নারী পুলিশ ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে সন্দেহের চোখে তাদের দেখল।
‘‘এ যুগের ছেলেরা...’’ বৃদ্ধ মাথা নেড়ে আফসোস করল।
‘‘তুমি এটা সঙ্গে রাখো কেন?’’ যুবক নারীকে জিজ্ঞেস করল।
‘‘নারীদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা। গত সপ্তাহে এই যন্ত্র দিয়ে আটাশজন উত্যক্তকারীকে শায়েস্তা করেছি। এখন এটা তোমাদের দিচ্ছি—কে যাবে বাঘকে ছ্যাঁকা দিতে?’’ নারী ডিভাইসটা হাতে এগিয়ে ধরল।
নিঃশব্দতা।
যুবক ও তরুণ পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইল।
‘‘দাদা, শুনেছি আজকাল বাঘগুলো খামারে বড় হয়...’’
‘‘ভাই, জানতাম তুই সাহসী, আমি আর চাই না। আমি পেছনে বাঘের মনোযোগ নেব, তুই সামনে গিয়ে কাজ সার!’’
‘‘তুমি তো আমার চেয়ে শক্তিমান!’’
‘‘কিন্তু দেখো, আমি তো পুরোপুরি জমে গেছি; বাঘের সঙ্গে লড়তে হলে চাই গতি, নিখুঁততা, তীব্রতা—আমি তো চলাফেরা করতে পারছি না, সব তোমার ওপর!’’
‘‘আমি তো মানবিক শাখার ছাত্র!’’
‘‘এটা কোনো অজুহাত?’’
‘‘মানবিক ছাত্ররা শরীরে দুর্বল!’’
‘‘কদিন আগে আমরা কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকে আটকাই, সবাই বিজ্ঞানের ছাত্র, সবাই শক্তপোক্ত...’’ নারী পুলিশ হঠাৎ বলল, আর যুবকের মুখ রক্তহীন থেকে কালচে হয়ে গেল।
‘‘বলেছিলাম তো...’’
‘‘কিন্তু সবাইকে মেরে কাঁদিয়ে ছেড়েছিল একজন হালকা-পাতলা মানবিক ছাত্র!’’
‘‘লো, তোমার বড়বাবু তো বলেছে আমাকে সাহায্য করতে!’’ তরুণ কাতর স্বরে বলল।
‘‘আউউউ...’’
‘‘এবার কী করব?’’
‘‘তুই মরলে মরব, একসাথে মরব! অন্তত একজন আরেকজনের জন্য ঢাল হতে পারব।’’
‘‘বুঝি না, এই শিক্ষিত মানুষেরা কেমন!’’
‘‘আরে, তোমরা দুজন!’’
বৃদ্ধ কাঁপা ঠোঁটে হেসে দুই যুবকের মাঝে হাত রাখল, ‘‘বাঘ তো এখনো আসেনি! এত ব্যাকুল হয়ে মরতে যাচ্ছো কেন!’’
‘‘ঠিকই তো! বাঘ তো এখনো আসেনি, চলো চলো!’’ যুবক বরফের গর্ত থেকে লাফ দিয়ে ছুটে চলল।
‘‘আমার ইলেকট্রিক ডিভাইস!’’ নারীও ছুটে গেল, দ্রুতগতিতে।
‘‘চলো, নইলে বাঘ এসে যাবে!’’ তরুণ ও নারী পুলিশ বৃদ্ধকে ধরে দ্রুত তাদের পেছনে অগ্রসর হলো।