অষ্টম অধ্যায় বিপদের মুখোমুখি (চতুর্থ)
যূথি প্রথমে কিবকের কাঁধে মাথা রাখল, ইতোমধ্যে থেমে যাওয়া চোখের জল ফের বাঁধ ভেঙে গড়িয়ে পড়ল। কিবকের পিঠের কাঁধের স্থানে তীব্র রক্তে ভিজে উঠেছে সাদা শিয়ালের লোমে ঢাকা মোটা চাদরটি। এক তরুণ চাকর তাড়াতাড়ি এসে তার ক্ষত পরীক্ষা করল এবং নিচু স্বরে বলল, ‘‘হাড়ে আঘাত লাগেনি, শুধু চামড়ার ওপর।’’
কিবক শান্ত গলায় সাড়া দিল, তারপর নির্দেশ দিল পাহাড়ি ডাকাতদের হাতে পড়া সব কিছু গাড়িতে তুলে আনতে। আর একপাশে ধরা পড়া পাহাড়ি ডাকাতদের কখন যেন দড়ি দিয়ে বেঁধে কোণায় বসিয়ে রাখা হয়েছে।
‘‘ক্ষমা করো...’’ যূথি শক্ত করে কিবকের জামা আঁকড়ে ধরে কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল, ‘‘আমি তোমার জন্য এই বিপদ ডেকে এনেছি, তুমি না হলে এই আঘাত পেতে না।’’
‘‘আমি ভালো আছি, এ কেবল সামান্য আঘাত,’’ কিবক নিচু হয়ে তার দিকে তাকাল, ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেলেও মুখে কঠোরতা কমে এসে একটুখানি কোমলতা ফুটে উঠল।
‘‘তুমি কিন্তু অনেক রক্ত হারাচ্ছো,’’ যূথির মুখ ফ্যাকাশে। গাড়ি থেকে টেনে নিয়ে যাওয়া মৃত দেহের দিকে সে একবারও তাকানোর সাহস পাচ্ছিল না। এতদিনে এই প্রথম সে মৃত্যুর এতটা কাছে এল, স্বপ্নের মতো অবাস্তব মনে হচ্ছে। সে ভাবেনি লোকটা মারা যাবে, কিন্তু সে না মরলে, হয়তো মরত সে নিজেই। তাই সে কিবকের নিষ্ঠুর আচরণকে দোষ দেওয়ার কোনো অধিকার বা কারণ খুঁজে পায়নি।
এখন সে গভীরভাবে বুঝেছে, এই প্রাচীন পশ্চাৎপদ জগতে তার নৈতিকতা, জীবনবোধ কতটা অচল। এখানে মানুষের জীবন ক্ষমতাবানের, আইনের শাসনে নয়।
এই সামন্ত সমাজের চিন্তাধারার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া ছাড়া তার আর কোনো উপায় নেই।
‘‘প্রভু, আঘাত গুরুতর না হলেও, ব্যান্ডেজ দরকার,’’ পাশের চাকরটি বিনম্র স্বরে বলল, কিন্তু সে কিবকের দিকে তাকাতে সাহস পেল না।
কিবক নিচু হয়ে যূথির চোখে তাকাল, কান্নায় ধোয়া দুটি চোখ পাহাড়ি ঝর্ণার মতো স্বচ্ছ, অস্থিরতা আর ভয়ের ছায়া এখনও জেগে আছে ওখানে।
‘‘বাইরে ঠান্ডা, চলো গাড়িতে গিয়ে ক্ষত বেঁধে দিই’’, অনুরোধের ভঙ্গিতে বলল যূথি। সে জানে কিবক তার আঘাতকে গুরুত্ব দেয় না, কিন্তু তার নিজের মনে অপরাধবোধ কুরে কুরে খাচ্ছে।
এমন সময় ইতিমধ্যে আতঙ্ক সামলে উঠা যূথির মা কাছে এলেন, ঠিক তখনই ওরা তার কথা শুনতে পেলেন। মা মুখের ভাব পাল্টে কিবকের দিকে তাকালেন, ‘‘তুমি আহত হয়েছো?’’
‘‘মা, আপনি ঠিক আছেন তো?’’ যূথি মাকে দেখে আবার দুঃখে চোখে জল এনে ফেলল।
‘‘আমি ভালো আছি, লীনি আহত, লিংযু তাকে গাড়িতে নিয়ে গেছে, প্রভু আহত, যূথি, প্রভুকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাও। আমি লীনির খোঁজ নিই।’’
‘‘মা...’’ যূথি কাঁপা গলায় ডাকল, ‘‘সাবধানে যাবেন।’’
মা মৃদু হাসলেন, ‘‘গাড়িতে ওষুধ আছে, একটু জলও আছে।’’
যূথি মাথা তুলল, কিবকের বাহু জড়িয়ে নিয়ে, গলা ধরে আসা স্বরে বলল, ‘‘এখনও রক্ত পড়ছে।’’
কিবক ভ্রু তুলে চাকরটির দিকে কড়া চোখে তাকাল, ‘‘এই ডাকাতদের ল্যু নগরের শাসকের কাছে নিয়ে যাও, সে যেন বিচার করে।’’
‘‘জি!’’, চাকরটি গম্ভীর মুখে আদেশ পালন করতে চলে গেল।
‘‘কিবক...’’, যূথি ভীতস্বরে ডাকল।
কিবক তার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঠোঁটে সামান্য হাসি টেনে বলল, ‘‘আর কান্না নয়।’’
যূথি ঠোঁট কামড়ে বলল, ‘‘তোমার ক্ষতে ওষুধ লাগিয়ে দেব।’’
কিবক আলতো সাড়া দিল, যূথি হাসল, তার হাসি যেন বসন্তের আলো, রূপের দীপ্তি কিবকের দৃষ্টি ধাঁধিয়ে দিল।
যূথি কিবককে গাড়িতে নিয়ে গিয়ে বাক্স ঘেঁটে রক্ত বন্ধের গুঁড়ো ও এক টুকরো রেশমী কাপড় বের করল।
‘‘তোমার কি ব্যথা লাগছে না?’’ ক্ষত থেকে এখনও রক্ত ঝরে, যূথি সহ্য করতে না পেরে মুখ ফিরিয়ে নিল। তার জীবনে এমন রক্তাক্ত দৃশ্য আগে কখনও আসেনি।
কিবক তার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, ‘‘এ তো সামান্য আঘাত।’’
‘‘তবে কি এর চেয়েও খারাপ আঘাত পেয়েছো?’’ যূথি তার কোলে গরম হিটর ঢুকিয়ে দিল, নাক জ্বালা দিয়ে আবার চোখে জল এসে গেল।
‘‘পুরুষ যখন যুদ্ধ করে, আঘাত অনিবার্য,’’ কিবক হিটর আঁকড়ে ধরে কণ্ঠ নরম করল, আধ হাত দূরে বসা যূথির দিকে তাকিয়ে চোখে হাসির রেখা ফুটে উঠল।
যূথি তাকিয়ে বুঝল, এ ব্যক্তি এক রাজপুত্র, রীতিমতো উচ্চ আসনের মানুষ।
‘‘তুমি তো রাজপুত্র, তবু যুদ্ধ করতে হয়?’’ আলতো করে তার চাদর খুলে নিল, চাদরে বড় ফাটল, রক্তে জমা দাগ।
চাদরের নিচে কিবকের গায়ে পাতলা জামা, কোমল কাপড়, ক্ষতের রক্তে জামার সঙ্গে লেগে আছে, দেখে গা শিউরে ওঠে। যূথি শ্বাস চেপে রাখল, এতটা রক্ত দেখে কিবক একে সামান্য আঘাত বলে!
‘‘আমি অন্য কাউকে ওষুধ লাগাতে বলি, তুমি দেখবে না,’’ কিবক জানে মেয়েটি এমন দৃশ্য আগে দেখেনি, মুখ ফিরিয়ে নিচু হয়ে তাকাল।
যূথি চুপচাপ তার গা ঘুরিয়ে, কাপড় ভিজিয়ে ক্ষতের চারপাশে ছুঁইয়ে দিল, যতক্ষণ না জামা ক্ষতের সঙ্গে আর এভাবে লেগে নেই, তারপর কিবকের জামার বোতাম খুলে দিতে গেল।
‘‘আমি নিজেই পারব,’’ কিবক তার গা ঘিরে থাকা যূথির লাল মুখের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকাল, কপালের ভাঁজ মুছে গেল।
জামা খুলে দেখা গেল শক্তপোক্ত শরীর, নিখুঁত গড়ন, বাড়তি চর্বি নেই, আবার অতিরিক্ত পেশির ভয়ও নেই, কিন্তু দেহে পুরনো ক্ষতের দাগ ছড়িয়ে আছে। যূথি তার প্রশস্ত কাঁধে চোখ রাখল, চোখের জল চেপে ক্ষতে ধীরে ধীরে ওষুধ ছড়িয়ে দিল, পাশে পাশে বাতাস দিতে লাগল।
‘‘ব্যথা পাচ্ছো?’’ যূথি নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, আঙুল ছুঁয়ে গেল তার উষ্ণ ত্বক, নিজেকেই যেন একটু কষ্ট লাগল।
কিবক ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলল, ‘‘ব্যথা নয়।’’
‘‘এখন তো দেশ শান্ত, তাহলে এত যুদ্ধ করতে হয় কেন?’’ যূথি রেশম কাপড় দিয়ে ক্ষত বেঁধে আলতো করে গিঁট দিল।
‘‘সীমান্তের ছোট ছোট রাজ্য, নানা জায়গার শাসকরা অনেক সময় অসন্তুষ্ট হয়, যুদ্ধ লাগা স্বাভাবিক,’’ কিবক নিচু হয়ে তার পেছন থেকে হাত বেড়ে আসা ছোট হাত দুটি দেখল, নাকে সুগন্ধ ভাসল, অস্বস্তিতে কাশি দিল।
‘‘ওহ্...’’, যুদ্ধ বোঝে না, রাজনীতি নিয়ে উৎসাহ নেই, যূথি আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
ক্ষত বেঁধে কিবক জামা পরে নিল, ফিরে উজ্জ্বল দৃষ্টিতে যূথির দিকে তাকাল। যূথির ফর্সা মুখে এখনও বিপদের ছাপ, চোখে কান্নার জল লেগে আছে, যেন প্রজাপতির ডানার মতো দুটি পাপড়ি, বড়ই করুণ ও মায়াবী।
‘‘আগামীতে এমন পরিস্থিতি এলে আর কখনও ঝুঁকি নেবে না!’’ কিবক গম্ভীর স্বরে বলল, ভ্রু কুঁচকে উঠল, দৃঢ় ও কর্তৃত্বপূর্ণ চেহারা। যূথির গলা শুকিয়ে গেল, ভাবল, এই মানুষটা এত তাড়াতাড়ি রূপ বদলায় কেন? এক মুহূর্তে বরফের পাহাড়!
‘‘তুমি কি বলছো, আমি কি তবে ছুই জিয়িনকে বাঁচাতে যাইনি, সেটাই ঠিক?’’ যূথি নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, ভুল কিছু বলে ফেলে তাকে রাগিয়ে দেবে বলে ভয়।
‘‘তুমি এখনও শিশু, মরে যাওয়ার ভয় না-থাকলেও ফলাফল ভাবতে হবে। এই দুনিয়ায় অন্যায় সর্বত্র, তুমি সবার জন্য কিছু করতে পারবে?’’ কিবক নিচু গলায় সতর্ক করল, যূথির মুখে উদাসীন ভাব দেখে তার ভেতর রাগ দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল।
‘‘তাহলে তুমি আমাদের কেন রক্ষা করলে, তুমি তো অন্যায়ের প্রতিবাদ করো?’’ যূথি চুপচাপ বলল, মনে মনে কষ্ট, তাকে শিশু ভাবার জন্য।
‘‘তোমার সঙ্গে আমার তুলনা হয়? তুমি কি তাদের সঙ্গে লড়তে পারবে? ভবিষ্যতে অযথা অন্যের বিষয়ে মাথা দেবে না, নিজের খেয়াল রাখো, অকারণে ঝামেলা বাড়াও না!’’ কিবকের ভ্রু কুঁচকে কঠিন চেহারা। সে তো ষোল বছর বয়সেই যুদ্ধ শুরু করেছে, আঠারোতে রাজপুত্র হয়, বাইশে আজো কেউ তার সঙ্গে এমন ব্যবহার করেনি, তার মর্যাদা চোখে দেখে না, মনে হয় রাজপুত্র আর সাধারণ মানুষে কোনো তফাত নেই।
যূথি ঠোঁট নেড়ে কিছু বলল না। তবে কি সত্যিই সে তাকে ঝামেলা মনে করছে?
‘‘তুমি ঠিকমতো শুনছো তো?’’ কিবক রাগী মুখে গলাটান দিয়ে বলল।
যূথি চমকে উঠে তাকিয়ে বলল, ‘‘আচ্ছা আচ্ছা, পরের বার মরার আগে কাউকে টেনে নিয়ে মরব, কারো জন্য বাড়তি কথা বলব না, এবার খুশি তো?’’ বলতে বলতে আবার কান্না শুরু করল, জীবনে কখনও এতবার কাঁদেনি।
কিবক তার শিশুসুলভ আচরণ দেখে হাসল, ‘‘ছোটদের রাগও কম নয়।’’
যূথি চোখ রাঙিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, ‘‘আমি ছোট নই, আমার বয়স তেরো, আর একটু পরেই বড় হব।’’ স্বরে একটু দুর্বলতা থাকলেও, তখনকার যুগে মেয়েরা পনেরোতে বিয়ে হয়, সে তেরোতে একেবারেই ছোট নয়।
কিবকের কিন্তু হঠাৎ মুখ গম্ভীর হয়ে গেল, ঠান্ডা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘‘তুমি একটু বিশ্রাম নাও।’’
যূথি বিস্মিত হয়ে দেখল কিবক চাদর তুলে গাড়ি থেকে নেমে গেল। সে কি ভুল কিছু বলল?