ষষ্ঠ অধ্যায় : সংকীর্ণ অজানা পথ (দ্বিতীয়)
যখন নিঃশব্দ, বিমনা মনে নিয়ে নিজ কামরায় ফিরল যুঁইচাঁপা, তখন বসন্ত-বিষাদ নিয়ে ভাবার অবকাশও পেল না সে। এতসব কাজ একসঙ্গে এসে পড়ল, নিজের হাতে কিছু করতে না হলেও, নিজের ঘরের জিনিস বলে সেও বাকিদের সঙ্গে জিনিস গোছাতে লেগে গেল; সব জিনিস আলাদা আলাদা করে ছোট ছোট চাকরদের দিয়ে গাড়িতে তুলিয়ে দিল।
এভাবে সারাদিন কেটে গেল। পরদিন সকালে, ভীত-সন্ত্রস্ত মনে সে মায়ের কাছে প্রণাম জানাতে গেল, বুঝতে পারছিল না মা এখনও রাগ করে আছেন কিনা।
লীলাবতী তখনই উঠোনে দাঁড়িয়ে ছিল, মুখভর্তি হাসি নিয়ে এগিয়ে এল, ‘‘দ্বিতীয় কন্যে!’’
‘‘লীলাবতী...’’ যুঁইচাঁপা ঠোঁটে মৃদু তিক্ত হাসি টেনে বলল।
লীলাবতীর মুখ প্রসন্ন, গোরার মতো ফর্সা, রাজকীয় ভাব ফুটে উঠেছে, সে নিচু গলায় বলল, ‘‘কন্যে, গতকাল গিন্নি সত্যিকারের রাগ করেননি, তিনি কেবল আপনার চিন্তায় উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন...’’
‘‘লীলাবতী!’’ যুঁইচাঁপা গলা তুলে বাধা দিল, তারপর মাথা নিচু করে মৃদু স্বরে বলল, ‘‘জানি, জানি...’’
লীলাবতী থমকে গেল, নিচু গলায় বলল, ‘‘দ্বিতীয় কন্যে?’’
‘‘আমি এবার মায়ের কাছে প্রণাম জানাতে যাচ্ছি।’’
যুঁইচাঁপা মুখ তুলে হাসল, চোখে ঝিলিক, হাসিতে এমন দীপ্তি যে লীলাবতী অপলক চেয়ে রইল।
যখন যুঁই মায়ের কাছে প্রণাম জানাল, তখন সে আগের মতোই মিষ্টি হাসল। যুঁইয়ের মা-ও যেন আগের দিনের ঝগড়ার কথা ভুলে গেছেন, দু’জনে সাধারণ কিছু আলাপ করল, মা বললেন, সব জিনিস ভালো করে গোছাতে, কারণ পরদিনই নিঙ্গনগরে ফিরতে হবে। পথে বরফ জমে আছে, তাই এবার হয়তো আগের চেয়ে বেশি কষ্ট হবে।
‘‘ভাবি, এবার তো যুঁইচাঁপার জন্মদিনও শীতের শুরুতেই পড়ল, তেরো বছর বয়স হয়ে গেল। আমি এখনও মনে করি, যুঁই যখন ছোট্ট ছিল, কতটাই না আদুরে ছিল সে।’’ যুঁইয়ের মা স্নেহভরে মেয়ের মুখের দিকে তাকালেন, সেই মুখের আড়াল দিয়ে বহু হারিয়ে যাওয়া দিনের স্মৃতি, আশা, প্রেম মনে পড়ল।
‘‘তবে কি আমার জন্মদিন শীতের শুরুতেই?’’ যুঁইচাঁপা অবাক হয়ে বলল, মনে মনে আনন্দে ভরে উঠল। এখন সে চাইছে তাড়াতাড়ি বড় হতে, বারো বছরের মেয়ে হিসেবে তো কিছুই করতে পারে না।
‘‘হ্যাঁ, সেই দিনই, শীতের শুরুতেই তোমার জন্মদিন। আর দু’বছর পরেই তো তোমার বিয়ে ঠিক হবে।’’ যুঁইয়ের মা মৃদু বিষণ্ণ হেসে বললেন, মনে মনে ভাবলেন, যাকে এতদিন বুকে আগলে রেখেছেন, তাকে এবার ছেড়ে দিতে হবে, মনটা ভারী হয়ে উঠল।
‘‘আমি বিয়ে করব না, চিরকাল মায়ের সঙ্গেই থাকব, হবে তো?’’ যুঁইচাঁপা মাকে জড়িয়ে মিষ্টি স্বরে বলল।
যুঁইয়ের মা কোমল হাসি হাসলেন, ‘‘বোকা মেয়ে, একদিন তো মাকেও তোমাকে ছেড়ে চলে যেতে হবে, তখন তুমিও কারও মা হবে।’’
‘‘মা...’’ যুঁইচাঁপার চোখের কোণে জল, মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, আর কখনো মাকে দুঃখ দেবে না।
‘‘ভালো মেয়ে, এবার গিয়ে বিশ্রাম নাও, কাল ফিরতে হবে, শরীর ঠিক রাখা দরকার।’’ যুঁইয়ের মা তার মুখের অশ্রু মুছে দিয়ে নরম গলায় বললেন।
‘‘আচ্ছা, তাহলে আমি যাই মা।’’ যুঁইচাঁপা মুখে হাসল, অথচ অন্তরে এক অজানা ভারী কষ্ট চেপে বসল।
পরদিন ভোরে, দাসী আর ছোট চাকররা সাজানো লাল কাঠের বাক্সগুলো একে একে গাড়িতে তুলতে লাগল। ছ’টি বড়, দ্বি-অক্ষ, চার চাকার ঘোড়ার গাড়ি ছিল তাদের, প্রথম তিনটি সাধারণ, মালপত্র ও ক’জন পাহারাদারদের জন্য। চতুর্থটি কিছুটা রাজকীয়, ভালো কাঠের তৈরি, জানালায় রেশমের কারুকাজ, এইটাই মূল গাড়ি। চার কোণে চারটি পিতলের ঘণ্টা ঝুলে আছে, বাতাসে মৃদু সুর বাজে। পঞ্চমটি দাসীদের জন্য, ষষ্ঠটিতে কয়েকজন বৃদ্ধা কাজের মহিলা।
সম্ভবত সকাল আটটা নাগাদ তারা রওনা দিল। গলির মুখ পার হয়ে, বড় এক চত্বর পেরিয়ে, দেখা গেল সেই বাড়ির প্রধান ফটক। বাড়িটি সামনে-পেছনে ভাগ করা, মাঝখানে চওড়া গলি। যুঁইয়ের মা যখন পেছনের অংশ কিনলেন, তখন আলাদা দরজা খুলে নিয়েছিলেন, যাতে সামনে যেতে না হয়।
যুঁইচাঁপা ও তার মা এক গাড়িতে, সঙ্গে লীলাবতী। অন্য গাড়িতে ছিল লিংইউ আর দাসীরা।
বড় চত্বর পেরনোর সময় যুঁইচাঁপা পর্দা তুলে বাইরে তাকাল, অদূরে ছোট্ট জলাশয়, তার ওপরে পাতলা বরফ, রোদে রূপালি ঝিলিক।
‘‘যুঁইচাঁপা, ভবিষ্যতে কখনও জলের ধারে কাছে যাবে না!’’ মায়ের দৃষ্টি অনুসরণ করে সে বললেন, মুখ গম্ভীর, গলায় সতর্কবার্তা।
যুঁইচাঁপা চমকে তাকাল, হয়তো সে এখানেই ডুবে গিয়েছিল? তবে কি সেই যুঁইচাঁপা এখানেই তার দেহ ছেড়ে দিয়েছিল, আর আমি তার দেহে এসেছি?
ক্ষমা করো...
যুঁইচাঁপা ক্রমশ দূরে সরে যাওয়া জলাশয়ের দিকে চেয়ে মনে মনে বলল, আমি তোমার হয়ে ভালোভাবে বাঁচব...
গাড়ি চলতে চলতে, বড় চত্বর পেরিয়ে প্রধান ফটক দেখা গেল। যুঁইচাঁপা চোখ তুলে দেখল, গাড়ির দরজা প্রায় তিন হাত চওড়া, উজ্জ্বল লাল, উৎকৃষ্ট কাঠের, কপাটে কালো রঙে সোনালী অক্ষরে লেখা, রং ফ্যাকাসে, সকালের আলোয় ঝলমল করছে—রাজপ্রাসাদ।
এটাই কি সেই পতিত রাজপরিবার? এতটাই দুরবস্থায় পড়েছে যে বাড়ি বিক্রি করতে হয়েছে?
তবে সামনের অংশ তো কিরণরাজ কিনে নিয়েছে, সে কেন দরজার ফলক বদলায়নি? রাজকীয় ঐতিহ্য প্রকাশ করতে তার নিজের নামের ফলক দেয়া উচিত ছিল।
মন খারাপ করে ভাবছিল যুঁইচাঁপা, হঠাৎ গাড়ি থেমে গেল, আশ্চর্য হয়ে মায়ের দিকে তাকাল। মা মৃদু হাসলেন, ‘‘পরিচিত কারও দেখা পেলাম, নেমে একটু কথা বলে আসি।’’
যুঁইচাঁপা বিস্ময়ে মা-র সঙ্গে নেমে এল। কিছুটা দূরে কয়েকটি লাল ঘোড়া, গুঙিয়ে, নাক ঝাড়ছে, বেশ চটপটে। বড় ফটকের সামনে, ক’জন উজ্জ্বল পোশাকের তরুণ, ঘোড়ার পিঠে মালপত্র গোছাচ্ছে। তাদের কোমরে তরবারি, কোনো সাধারণ চাকর নয়।
হঠাৎ, একজন কালো পোশাকে, সাদা শিয়ালের লোমের কোট পরে, গম্ভীর, অনবদ্য ব্যক্তিত্ব নিয়ে বেরিয়ে এল।
যুঁইচাঁপার চোখ বিস্ময়ে ছানাবড়া—কিরণরাজ?
‘‘যুঁইয়ের মা,’’ কিরণরাজ দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে এল, ঠোঁটে হালকা হাসি, সম্মানের সাথে সম্ভাষণ করল।
‘‘রাজাধিরাজ,’’ যুঁইয়ের মা কোমল হাসি হাসলেন, হাসিতে ফুটে উঠল প্রস্ফুটিত ফুলের সৌন্দর্য।
যুঁইচাঁপা হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।